দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) থেকে পাওয়া ৬০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত অবনতি এবং চিকিৎসায় দেরি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল তিন থেকে আট মাস বয়সী। এ বয়সসীমার ২৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের অনেকেরই হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার বয়স তখনও হয়নি। এছাড়া ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী ২১টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুই বছর থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে মারা গেছে সাত শিশু এবং একটি ৯ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া গেছে।
লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৩১ এবং মেয়ে ২৯ জন। অর্থাৎ ছেলে ও মেয়ে শিশুর মৃত্যুহারে তেমন বড় পার্থক্য নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৬ জন এবং নিশ্চিত হামে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫৬ জন এবং নিশ্চিত হামে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের ধারণা, মোট ৪২৪ মৃত্যুই মূলত হামজনিত।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, অনেক শিশুই হাসপাতালে আনার আগেই গুরুতর অবস্থায় ছিল। পাঁচটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির দিনই। ভর্তি হওয়ার এক দিনের মধ্যে মারা গেছে আরও ৯ শিশু এবং দুই দিনের মধ্যে মারা গেছে আরও ৯ জন। অর্থাৎ প্রথম দুই দিনের মধ্যেই ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে, ১০ দিন বা তার বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা গেছে ১৭ শিশু। একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৩৭ দিন পর।
হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই মারা গেছে ১৫ শিশু, যাদের বেশির ভাগই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
মোট ৬০ শিশুর মধ্যে ৪৮ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বাকি ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকার বাইরের হাসপাতালে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য বিশ্লেষণে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অনেক শিশুর টিকাগ্রহণের তথ্য, আগের চিকিৎসা ইতিহাস কিংবা আইসিইউতে ছিল কি না—এসব তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে অন্তত ৩১ জনের টিকা নেওয়ার বয়স হয়েছিল। কিন্তু তারা টিকা পেয়েছিল কি না, পূর্ণ দুই ডোজ সম্পন্ন করেছিল কি না—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না থাকায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
মন্তব্য করুন